
সঙ্গে চলমান সাত মাসের সংঘাত নিরসন এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নৌঅবরোধ তুলে নিতে সাত দিনের একটি সংক্ষিপ্ত ‘রোডম্যাপ’ বা রূপরেখা প্রস্তাব করেছে ইরান। নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের ফাঁকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি।
পর্দার অন্তরালে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলতি সপ্তাহের শুরুতেই প্রস্তাবটি ওয়াশিংটনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মধ্য দিয়ে সূচিত এই সংঘাত প্রায় সপ্তম মাসে পা দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নৌঅবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, যার মারাত্মক অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে বিশ্বজুড়ে।
ইরানের নতুন এই প্রস্তাবে মূলত গত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্মত হওয়া সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবে যুদ্ধবিরতি আলোচনা পুনরারম্ভ ও নৌপথ পুরোপুরি উন্মুক্ত করার জন্য মার্কিন প্রশাসনকে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণে সাত দিনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে।
মার্কিন দৈনিক দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের দেওয়া শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—গাজা ও লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সবকটি ফ্রন্টে অবিলম্বে সামরিক সংঘাত বন্ধ করা, যুক্তরাষ্ট্রে বাজেয়াপ্ত ইরানের অন্তত ১,২০০ কোটি ডলারের আর্থিক সম্পদ ছাড়করণ, ইরানি জ্বালানি তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের বন্দরগুলোতে আরোপিত মার্কিন নৌঅবরোধ তুলে নেওয়া।
প্রস্তাবিত সময়সীমার সপ্তম দিনে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তেহরান। এর পরপরই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন ও তদারকি নিয়ে মূল আলোচনায় বসতে রাজি ইরান—যা মার্কিন প্রশাসনের মতে এই সংঘাতের মূল ভিত্তি।
এর আগে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ১৭ জুন উভয় দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেখানে কূটনৈতিক আলোচনার জন্য ৬০ দিন সময় ধরা হয়। তবে নথির ভাষার অস্পষ্টতা এবং একের পর এক পাল্টাপাল্টি সামরিক উসকানির মুখে সেই প্রচেষ্টা ভেস্তে যায়। পরবর্তীতে ৭ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করেন। তবে সম্প্রতি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পুনর্ব্যক্ত করেন যে, ওয়াশিংটন পূর্ব প্রতিশ্রুতি বজায় রাখলে তেহরানও ইতিবাচক সাড়া দিতে প্রস্তুত।
হোয়াইট হাউসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে জানান, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে পরোক্ষ যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। তবে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সূত্রমতে, কোনো তাড়াহুড়ো করে চুক্তি স্বাক্ষর করার পক্ষে নয় মার্কিন প্রশাসন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই সাত দিনের রোডম্যাপ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান স্থবিরতারই প্রতিফলন। জেনেভা গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক ইতিহাস ও রাজনীতির অধ্যাপক সাইরাস শায়েগ আল জাজিরাকে বলেন, “মৌলিক বৈপরীত্যগুলো অপরিবর্তিত রয়েছে। সামরিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে ইরান আগের সমঝোতায় ফিরতে চাইছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করতে নারাজ। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে নির্ধারিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন জটিল সংকটের টেকসই সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।”
তবে ওয়াশিংটনের নির্বাচনকে কোনো প্রধান নিয়ামক মানতে নারাজ তেহরান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি উল্লেখ করেন, মার্কিন নির্বাচনের আগেই সমঝোতা হলে তা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক হবে।
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক: স্বাধীন চৌধুরী
©২০২৬ নিউজ রেজিস্টার বাংলা