শিশু যখন একটি গাছের দিকে তাকায়, সে শুধু গাছ দেখে না। পাতার ফাঁকে সে পাখির বাড়ি দেখে, ডালে দোলনা দেখে, কখনো মনে করে—গাছটি বুঝি একদিন হেঁটে হেঁটে বনের দিকে চলে যাবে। বড় হয়ে আমরা পৃথিবীকে তার ব্যবহারিক নাম ও সংজ্ঞায় ফিরিয়ে নিই। তখন গাছ আর হাঁটে না, মেঘ কথা বলে না, পিঁপড়ে মানুষের মতো ভাবতে পারে না, বৃষ্টিও আর বন্ধু হয়ে ওঠে না। ছড়াকার আমীরুল ইসলাম বারবার ফিরে গেছেন সেই বিস্ময়ের কাছে—যেখানে পৃথিবী এখনো পুরোপুরি ব্যাখ্যা হয়ে যায়নি।
তাঁর ছড়ার ভেতর এক অন্যরকম পৃথিবী আছে। সেখানে অসম্ভবও স্বাভাবিক। গাছ হাঁটে, মানুষ পিঁপড়ে হয়ে যায়, ভূত শহরে আসে, বৃষ্টি বন্ধুত্ব করতে চায়। শিশু দাঁড়িয়ে থাকে সেই আশ্চর্য জগতের মাঝখানে—চোখ মেলে, হাসে, প্রশ্ন করে এবং নিজের কল্পনায় পৃথিবীটিকে নতুন করে সাজায়। এখানেই আমীরুল ইসলামের ছড়ার মৌলিক শক্তি। তিনি শিশুর জন্য লিখেছেন, কিন্তু শিশুকে কখনো ছোট করে দেখেননি।
শিশুসাহিত্যে দীর্ঘদিন একটি প্রবণতা ছিল—শিশুকে কিছু শেখাতে হবে। ভালো হও, সত্য বলো, নিয়ম মানো, বড়দের কথা শোনো। আমীরুল ইসলামের ছড়া সেই সরাসরি শিক্ষার ভার এড়িয়ে শিশুকে দিয়েছেন আরও মূল্যবান এক জিনিস—কল্পনা করার স্বাধীনতা।
তাঁর ছড়ার নামগুলোর মধ্যেই সেই স্বাধীনতার আভাস পাওয়া যায়—‘আমি সাতটা’, ‘দশরকম দশটা’, ‘ভূত এলো শহরে’, ‘আমি একদিন পিঁপড়ে হয়ে গিয়েছিলাম’, ‘বৃষ্টি তুমি বন্ধু হবে’, ‘গাছটা হেঁটে হেঁটে বনের দিকে যাচ্ছে’, ‘গাছেরা ম্যাজিক জানে’। পরিচিত পৃথিবীকে খানিকটা উল্টে দিয়ে তিনি শিশুকে যেন বলেন—আরেকভাবে দেখো। যা অসম্ভব বলে জানো, কল্পনায় তাকে সম্ভব করে দেখো।
এই ‘উল্টে দেখা’ নিছক কৌতুক নয়। শিশুমনের স্বাভাবিক স্বাধীনতার সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক আছে। শিশু যে পৃথিবী দেখে, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অনেক সময় সেই পৃথিবীকে অভ্যাসের চোখে দেখে। আমীরুল ইসলাম সেই অভ্যাসের চোখ সরিয়ে বিস্ময়ের চোখ ফিরিয়ে দিতে চেয়েছেন।
তাঁর ছড়ার প্রাণে আছে ছন্দ। কিন্তু ছন্দ তাঁর কাছে শুধু অন্ত্যমিল বা মাত্রার হিসাব নয়; শব্দের ভেতরের গতি, ধ্বনি ও আনন্দও তাঁর ছন্দের অংশ। তাঁর ভাষা সহজ, কিন্তু সেই সহজতার ভেতর থাকে শব্দের কারুকাজ। একটি শব্দ কখনো অর্থের জন্য, কখনো ধ্বনির জন্য, কখনো নিছক আনন্দের জন্য এসে বসে। ফলে তাঁর ছড়া যেমন পাঠের সাহিত্য, তেমনি শ্রবণেরও সাহিত্য।
শিশু যখন একটি ছড়া মুখস্থ করে, তখন সে শুধু শব্দ মনে রাখে না; শব্দের গতি, বিরতি, পুনরাবৃত্তি ও ধ্বনিকে নিজের শরীরের মধ্যে ধারণ করে। একটি ভালো ছড়া তাই শিশুর ভাষাবোধের পাশাপাশি তার শ্রুতিবোধও তৈরি করে। আমীরুল ইসলামের ছড়ায় এই শ্রুতিময়তা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
তবে তিনি প্রচলিত ছড়ার কাঠামোর মধ্যেই নিজেকে আটকে রাখেননি। ছন্দ ও অন্ত্যমিলের পরিচিত পথ থেকে বেরিয়ে গদ্যছড়ারও পরীক্ষা করেছেন। ‘লাল পিঁপড়ের গল্প’-এর মতো রচনায় প্রচলিত ছন্দ না থাকলেও দৃশ্যের পর দৃশ্য, শব্দের পর শব্দ, ছোট ছোট প্রাণী ও প্রকৃতির অনুষঙ্গ মিলে এক ধরনের নিজস্ব গতি তৈরি করে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—ছড়া কি শুধু অন্ত্যমিলের নাম? ছড়া কি নির্দিষ্ট ছন্দের শরীরেই সীমাবদ্ধ? নাকি শব্দ ও দৃশ্যের এমন বিন্যাসও ছড়ার নিজস্ব সংগীত তৈরি করতে পারে, যা পাঠকের মনে অদৃশ্য তাল জাগায়?
এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর হয়তো তাঁর সব রচনায় একইভাবে পাওয়া যাবে না। কিন্তু একজন সৃষ্টিশীল লেখকের গুরুত্ব শুধু তাঁর সফল পরীক্ষায় নয়, পরীক্ষা করার সাহসেও। সেই সাহস আমীরুল ইসলামের ছিল। তাঁর কাছে ছড়া কোনো স্থির ছাঁচ নয়; ছিল একটি চলমান শিল্পভাষা।
তাঁকে শুধু হাসির ছড়াকার হিসেবেও দেখলে তাঁর সাহিত্যকে ছোট করে দেখা হবে। তাঁর ছড়ায় দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক অসংগতি, সমকালীনতা এবং মানুষের বিচিত্র আচরণও এসেছে। সামান্য একটি ঘটনা কখনো কৌতুক, কখনো ব্যঙ্গ, কখনো বিস্ময়, কখনো শিশুর প্রশ্ন হয়ে ফিরে এসেছে। ফলে তাঁর শিশুসাহিত্য বাস্তবতা থেকে পালিয়ে যায়নি; বরং বাস্তবতাকে শিশুর উপযোগী এক ভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করেছে।
এখানেই তাঁর ছড়ার আরেকটি তাৎপর্য।
শিশুসাহিত্যকে অনেক সময় বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন আনন্দের জগৎ মনে করা হয়। অথচ যে শিশু শহরে থাকে, যানজট দেখে, দূষণ দেখে, প্রযুক্তির বিস্ময় দেখে, পরিবারের টানাপোড়েন অনুভব করে, মানুষের বৈষম্য দেখে। তার ভাষা শুধু আলাদা। আমীরুল ইসলাম সেই আলাদা ভাষাটিকে চিনেছিলেন। তাই ভারী বক্তব্য শিশুর ঘাড়ে চাপিয়ে না দিয়ে হাসি, কৌতুক, কল্পনা ও শব্দের খেলার মধ্য দিয়ে সময়কে তাঁর সাহিত্যে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছেন।
তাঁর সৃষ্টির পরিসরও ছিল বিস্তৃত। ছড়া-কবিতার পাশাপাশি গল্প, উপন্যাস, জীবনী, প্রবন্ধ, অনুবাদ, বিজ্ঞান, ইতিহাস, নাটক, গান, ভ্রমণসহ শিশুসাহিত্যের নানা শাখায় তিনি লিখেছেন। তাঁর বিপুল সৃষ্টির কারণে তাঁকে শুধু ‘ছড়াকার’ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর সাহিত্যিক পরিসরের একটি বড় অংশ অনালোচিত থেকে যায়, বরং তাঁকে দেখা যায় শিশুসাহিত্যের একজন নিরন্তর অনুসন্ধানী হিসেবে। শিশুর পৃথিবী যেমন একরৈখিক নয়, তাঁর সাহিত্যও তেমন নয়। একদিকে ছড়া, অন্যদিকে বিজ্ঞান; কোথাও গল্প, কোথাও ইতিহাস; কোথাও জীবনী, কোথাও অনুবাদ। অর্থাৎ শিশুকে তিনি শুধু একটি বয়সের পাঠক হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন একটি বিকাশমান হৃদয় হিসেবে—যে একই সঙ্গে গল্প চায়, তথ্য চায়, খেলা চায়, প্রশ্ন করতে চায় এবং পৃথিবীকে বুঝতে চায়।
সমকালীন সৃজন ও মননশীল ব্যক্তিবর্গের স্মৃতিচারণে তাঁর প্রাণবন্ততা, রসবোধ এবং তাৎক্ষণিক ছড়া তৈরির ক্ষমতার কথাও এসেছে। তাঁর ছড়ার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিত্বের স্বাভাবিক যোগসূত্র ছিল। শিশুর জন্য লিখতে গেলে শুধু শিশুর মন বুঝলেই হয় না; নিজের ভেতরের শিশুটিকেও বাঁচিয়ে রাখতে হয়। আমীরুল ইসলাম সেই শিশুটিকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
তাঁর সাহিত্যিক স্বীকৃতির ইতিহাসও দীর্ঘ। ‘খামখেয়ালি’ ছড়াগ্রন্থের জন্য অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার পর তাঁর স্বীকৃতির পথ বিস্তৃত হয়। ২০০৬ সালে শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। কিন্তু একজন শিশুসাহিত্যিকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়তো কোনো পদক নয়। বড় পুরস্কার কোনো এক শিশুর মুখে তাঁর ছড়া উচ্চারিত হওয়া; কোনো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে তাঁর ছড়া পড়ানো; কোনো এক বাবার সন্তানের হাতে তাঁর বই তুলে দেওয়া; কিংবা বহু বছর পর কোনো প্রাপ্তবয়স্ক তাঁর ছড়ার বই খুলে হঠাৎ নিজের হারিয়ে যাওয়া শৈশব ফিরে পাওয়া—সাহিত্যের প্রকৃত জীবন সম্ভবত সেখানেই।
আমীরুল ইসলাম চলে গেছেন। একজন লেখকের শরীরী মৃত্যু হলেও তাঁর সৃজনের মৃত্যু নেই; এর মাঝেই লেখক বেঁচে থাকেন। আমীরুল ইসলাম তাঁর সৃজনসম্ভারে বেঁচে থাকবেন নিশ্চয়ই।
তাঁর সাহিত্য নতুন করে পড়ার প্রয়োজন আছে। তাঁর ছড়ার গভীরে শুধু হাসি নয়; আছে বিস্ময়। শুধু শব্দের খেলা নয়; আছে ভাষাবয়ানের সুষমা। শুধু শিশুর আনন্দ নয়; আছে পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখার আহ্বান। বড় কথা, তাঁর লেখায় আছে কল্পনার অবারিত স্বাধীনতা।
একটি শিশু যখন গাছকে শুধু গাছ হিসেবে না দেখে ভাবে—গাছটি যদি হেঁটে বনের দিকে চলে যায়? যখন সে একটি পিঁপড়ের শরীরে নিজেকে কল্পনা করতে পারে, বৃষ্টিকে বন্ধু ভাবতে পারে, তখন সাহিত্য তার কাজটি করে ফেলেছে। তাকে কোনো নীতিবাক্য মুখস্থ করাতে হয়নি; শুধু তার চোখের সামনে পৃথিবীর আরেকটি দরজা খুলে গেছে। সেই দরজাটিই হয়তো আমীরুল ইসলামের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
তিনি শিশুকে শুধু গল্প দেননি, দিয়েছেন কল্পনার দারণ স্বাধীনতা। দিয়েছেন পরিচিত পৃথিবীকে অন্য চোখে দেখার স্বাধীনতা। দিয়েছেন শব্দের সঙ্গে খেলার আনন্দ। আর সে কারণেই তাঁর ছড়ার ভেতর যে শিশুটি একদিন জন্ম নিয়েছিল, আমীরুল ইসলাম চলে গেলেও সে শিশুটি থেকে যাবে—কোনো বইয়ের পাতায়, শিশুর উচ্চারণে, শ্রেণিকক্ষের আবৃত্তিতে, মায়ের কণ্ঠে কিংবা কোনো প্রাপ্তবয়স্কের হঠাৎ ফিরে পাওয়া শৈশবে।
হয়তো কোনো এক শিশু একদিন আবার ভাববে—গাছটা যদি হেঁটে হেঁটে বনের দিকে যেতে পারে, মানুষও কি শব্দের ভেতর দিয়ে একটু দূরে চলে যেতে পারে না? পারে। সেই দূরত্বের নাম কল্পনা।
আর সেই কল্পনার পথের পাশে, শব্দের ভেতর, ছন্দের আড়ালে—আমীরুল ইসলাম হয়তো এখনো আছেন একটি শিশুর বিস্মিত চোখের দিকে তাকিয়ে।
