মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের রেশ ধরে বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই দেশের বাজারে তেলের এক দফা দরবৃদ্ধি তৈরি পোশাক খাতের জন্য যেন মারার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট, চাহিদামতো গ্যাস না পাওয়া এবং বিশ্ববাজারের মন্দা— এই তিনমুখী চাপে দেশের ৮০ শতাংশেরও বেশি রপ্তানি আয় অর্জনকারী খাতটি এখন অস্তিত্ব রক্ষার তীব্র প্রতিযোগিতায় মুখ থুবড়ে পড়ার ঝুঁকিতে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সরকার জ্বালানি তেলের দাম লিটারে সর্বোচ্চ ২০ টাকা (প্রায় ১৭.৪ শতাংশ) বৃদ্ধি করার পর তৈরি পোশাক মালিকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হয়েছে। সরকারি তথ্য মতে, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যে যে সংঘাতের সূত্রপাত, তার ধাক্কায় বিশ্ববাজারে ক্রুড অয়েলের দাম ও জাহাজ পরিবহন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প ছিল না।
তবে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শিল্প খাতে অত্যন্ত নির্মম রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি ১৩৪টি নিটওয়্যার কারখানার ওপর পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে এক আশঙ্কাজনক চিত্র। আগস্টের শেষ দিক থেকে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ৫৫ শতাংশ কারখানায় বিদেশি ক্রেতারা তাদের ক্রয়াদেশ (অর্ডার) হয় বাতিল করেছেন, না হয় নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিয়েছেন। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ৭৮ শতাংশ কারখানা তাদের উৎপাদন আংশিক বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
রপ্তানিকারকরা জানাচ্ছেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস না পাওয়ায় সময়মতো কারখানা থেকে পণ্য বের করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ক্রেতাদের নির্ধারিত ডেডলাইন মিস করায় বাধ্য হয়ে অনেক উদ্যোক্তাকে চড়া মাশুলে উড়োজাহাজে (এয়ার ফ্রেইট) পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাতিল হওয়া অর্ডার সামলাতে বড় অঙ্কের মূল্যছাড় (ডিসকাউন্ট) দিতে হচ্ছে।
পোশাক রপ্তানিকারক ও উদ্যোক্তা শহীদুল্লাহ আজিম পরিস্থিতির ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “আমাদের এমনিতেই প্রফিট মার্জিন বা মুনাফার হার অত্যন্ত কম। তার ওপর তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে আমাদের কোণঠাসা করে ফেলবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এত বাড়তি পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বহন করে টিকে থাকা আমাদের জন্য এক বিরাট পরীক্ষা।”
নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে আজিম জানান, সম্প্রতি এক কানাডীয় ক্রেতা ২৫ হাজার পোশাকের অর্ডার দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থেকেও পিছিয়ে এসে মাত্র ৮ হাজার পোশাকের অর্ডার নিশ্চিত করেছেন। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায় বড় ধরনের ধস নেমেছে বলে মনে করছেন তিনি।
সংকট সামলাতে বিকল্প প্রযুক্তিতে ভরসা
চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেও কিছু কারখানা তাদের বিকল্প কৌশল ও দূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে উৎপাদন সচল রাখতে পারছে। ঢাকার শহরতলীতে অবস্থিত ৭ হাজার ৫০০ শ্রমিকের কারখানা ‘ফোরএ ডাইং’ তার একটি বড় উদাহরণ। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ওয়ালমার্ট, গ্যাপ ও নেক্সটের পণ্য সরবরাহকারী এই প্রতিষ্ঠানটি বেশ কয়েক বছর ধরেই নিজেদের অর্জিত বিকল্প শক্তিতে নির্ভর করে টিকে আছে।
২০১৯ সাল থেকে সোলার প্যানেল বসিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে আসছে ফোরএ। বর্তমানে কারখানাটির প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের ৪০ শতাংশই আসছে তাদের সোলার প্যানেল থেকে, আর বাকি অংশ মেটানো হচ্ছে ডিজেলে চলা জেনারেটর দিয়ে।
ফোরএ-এর অন্যতম মালিক আবদুল্লাহ হিল রাকিব বলেন, “আমরা কখনোই জ্বালানির একক উৎসের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম না। তবে এখন ব্যবসা পরিচালনার খরচ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় আমাদের উৎপাদন খরচ ২ থেকে ৩ শতাংশ বেড়ে গেছে, যার ফলে প্রতি মাসে শুধু জ্বালানি বাবদই অতিরিক্ত ৫০ লাখ টাকা গুণতে হচ্ছে।”
ভবিষ্যতের আরও বড় ধাক্কা এড়াতে ফোরএ এখন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বড় শিল্প-ব্যাটারি সিস্টেম (Energy Storage System) স্থাপনের পরিকল্পনা করছে, যেন শতভাগ লোডশেডিংয়ের মধ্যেও কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন অক্ষুণ্ন রাখা যায়। তবে রাকিব সতর্ক করে বলেন, “আমাদের মতো মাঝারি বা বড় প্রতিষ্ঠান হয়তো এই ধাক্কা সামাল দিচ্ছে, কিন্তু দেশের অধিকাংশ মাঝারি ও ছোট কারখানার পক্ষে এই বিশাল অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা অসম্ভব।”
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা
বাংলাদেশ যখন জ্বালানি সংকটে হিমশিম খাচ্ছে, তখন প্রতিযোগী দেশগুলো বাজার দখলের লড়াইয়ে সুবিধাজনক স্থানে রয়েছে। ‘ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেড’-এর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, সংকট শুধু খরচের নয়, সংকট নির্ভরযোগ্যতার।
তিনি বলেন, “ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে এই মুহূর্তে আমাদের মতো এত তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য পৌঁছানোটাই সবচেয়ে বড় শর্ত। আমরা যদি জ্বালানি সংকটের কারণে লিড টাইম (উৎপাদন ও সরবরাহের সময়) ধরে রাখতে না পারি, তবে ক্রেতারা অন্য দেশে চলে যাবে। এই সংকট কীভাবে আমরা দ্রুত মোকাবেলা করি, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্বে আমাদের শীর্ষ অবস্থান টিকে থাকবে কি না।”
জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ জোগান দেওয়া এবং ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান জড়িয়ে থাকা এই খাতকে রক্ষা করতে দ্রুত ও কার্যকর নীতিগত সহায়তা না এলে সামনে আরও বড় দুর্যোগের মুখোমুখি হতে পারে দেশের অর্থনীতি।
